শুভ জন্মদ‍িন ব্রোকেন ইণ্টেলেকচুয়াল

১৯৭১ সাল। কলকাতার পার্ক স্ট্রিট। সূর্য ঠিক মাথা বরাবর আগুন ঢেলে দিচ্ছে। তীব্র তাপদাহে ক্লান্ত অবসাদগ্রস্থ কলকাতা তখন মধ্য দুপুর অতিক্রম করছে। ঠিক সেই সময়, একটি আস্তো মানুষ পরনে ধূলিমলিন সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। এক মাথা এলোমেলো চুল। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। আর মুখোভর্তি বিন্দু বিন্দু ঘাম। কাঁধে ঝুলানো শান্তি নিকেতনী ব্যাগ। লোকটির পিছনে একটা কালো রঙের বিশাল ব্যানার।  তাতে বড় বড় করে সাদা অক্ষরে বাংলা এবং ইংরেজিতে লেখা, “বাংলাদেশের শরনার্থীদের জন্য দান করুন।” এবং রেলিং ঘেঁষে রাখা একটা বড় বাক্স ।

লোকটির খাওয়া-পরার সময় নেই। তাঁর মনপ্রাণ জুড়ে উৎকণ্ঠা,বিষাদগ্রস্থতা শুধুমাত্র একটা যুদ্ধ নিয়ে। তিনি তাঁর মুখেই উচ্চারণ করেন, “ভারি অন্যায় যুদ্ধ; যুদ্ধটাকে ঘিরে পৃথিবী এখন পশু আর মানুষে দু-ভাগে ভাগ হয়ে পড়েছে। আর পদ্মা-মেঘনার দেশে কত যে রক্ত ঝরছে এই মুহূর্তে। এই মুহূর্তে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে শিশুর কচি হাত আর পা। সুতীক্ষ্ণ বেয়োনেটে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে শিশুর মায়ের বুক। পুড়ে যাচ্ছে আজন্ম পরিচিত মমতায় ঘেরা ঘর-বাড়ি। বাংলার পলিমাটিতে জমে আছে লাশের স্তুপ। বাংলার নীলাভ আকাশে ক্ষুধার্ত শকুনের উড়াল। বহু নীচে নদীর জল। সে জলে লাশ, নদীর পাড়ে লাশ, রাস্তায় লাশ, কলারঝোপে লাশ, উঠানে লাশ, কুয়ায় লাশ, বাড়ির ভিতরে লাশ, বাড়ির বাইরে লাশ, লাশ লাশ আর লাশ আর….।”

ritwik-ghatak_001

এই লোকটি যিনি পায়চারী করছেন পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে । যিনি ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের জমানো টাকা দিয়ে কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ আর কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে বারাসাতের শরনার্থী শিবিরে পাঠিয়ে দিয়েছেন । এই সেই বিখ্যাত মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ মহামঙ্গা-মহাক্রান্তিকালে যিনি কলকাতার বনগাঁ পরিদর্শনে এসেছিলেন। উন্মাত্তাল ‘৭১ কলকাতার বনগাঁয়ে পূর্ববঙ্গের হাজার হাজার শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। স্বদেশ জ্বলছে, পালিয়ে এসেও এই ক্যাম্পে লড়তে হচ্ছে ক্ষুধার সাথে , মরণের সাথে। মরা লাশ, কলেরা-ডায়রিয়ায় মরণযন্ত্রণা ভোগা লোকদের সামনে তখন শুধু বাঁচার আকুতি । সেই দুঃখ-দুর্দশার চিত্র অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর বিখ্যাত ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতায় তুলে ধরেছিলেন । এই কবিতাটি পরে গান হিসেবে বিখ্যাত হয়েছিল ।

আবার আসি সেই আমাদের মস্তিষ্কে বসে থাকা কাঁধে ঝুলানো শান্তি নিকেতনী ব্যাগের মলিন লোকটির কাছে। বুদ্ধিজীবী মহলে তিনি তখন শহরের আলোচিত চরিত্র। তাঁর মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা, অযান্ত্রীক তখন মানুষের কাছ পৌঁছে গেছে। পত্র‍িকার পাতায় পাতায় তাঁর সব সৃষ্টি নিয়ে আলাপ জমে উঠেছে। তাঁকে বলা হচ্ছে, তিনি তাঁর সময় থেকে কয়েক যুগ এগিয়ে চিন্তা করতে পারেন। তিনি তখন এক বিস্ময়। কিন্তু একাত্তর তাঁকে নামিয়ে ছাড়লো পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাতে-তপ্ত রাস্তায়। পদ্মা পারে মানুষের কষ্ট তাঁকে যন্ত্রণা দিল, পদ্মা চরের সাদা কাশবনের পাশে তিনি দাঁড়ালেন। তিনি পদ্মা-মেঘনাকে বুকে টেনে নিলেন। নিজের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করলেন নিজের মা-মাটির অস্তিত্বের সংগ্রামে শরীক হতে।

পাবনার মেয়ে পরবর্তীতে কলকাতার জনপ্রিয় নায়িকা সুচিত্রা সেন বলেছিলেন, তাঁর পরম শ্রদ্ধ‍েয় ঋত্ব‍িক ঘটকের ত্রাণ বাক্স‍ে একশ টাকা দান দিয়েছিলেন। তিনি এও জানিয়েছিলেন তাঁর বিস্ময়ে শুধু ঋত্ব‍িক দা-ই কয়‍কমাস মাথায় চেপে বসেছিলেন। অনবদ্য অস্থ‍ির এক মানুষ।

১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার জিন্দাবাজারের জন্ম গ্রহণ করেছিলেন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক। ঋষিকেশ দাশ লেনে ঐতিহ্যময় ঘটক বংশে জন্মগ্রহণ করেন। ঋত্বিক ঘটকের বংশের আদি পুরুষ পণ্ডিত কবি ভট্টনারায়ণ। ঋত্বিকের বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং তিনি কবিতা ও নাটক লিখতেন। তার বদলীর চাকুরীর কারণে তারা ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্তে। ঋত্বিক ঘটকের শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে রাজশাহী শহরে। তিনি রাজশাহীর কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন এবং ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ পাশ করেন। ১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের পরে পূর্ববঙ্গের প্রচুর লোক কলকাতায় আশ্রয় নেয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর পরিবারও কলকাতায় চলে যায়। তবে দেশভাগে যন্ত্রণা তাঁকে যন্ত্রণা দিয়েছে মৃত্যুর আগ অব্দি। মাতৃভূমির এতই ভালোবাসা এতই প্রেম ছিল বিভিন্ন সময় তার সিনেমাগুলোতে দেখেছি।

১৯৫২ সালে পর পর পূর্ব বাঙলা তখন সবেমাত্র তার মাতৃভাষা ছিনিয়ে এনেছে। সেই সময় ঋত্বিক ঘটক এবং আরেকজন বিখ্যাত বাঙালি পরিচালক সত্যজিৎ রায়কে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সত্যজিৎ জানাচ্ছেন, “যখন বিমান পদ্মার উপর দিয়ে যাচ্ছিল তখন ঋত্বিক চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন।” এই সেই পদ্মার জল যেখানে ঋত্বিক জলে অবঘাহন করেছিলেন, এই সেই পদ্মার চর বাল্যবন্ধুদের সঙ্গে ঋত্বিকের সময় কেটেছে, এই সেই পদ্মার তীর যেখানে তাঁর আদি পিতা-মাতার শেকড়। ঋত্বিক ঘটক পরিষ্কারভাবেই পেটে চুরি মেরে আনা এই দেশভাগের স্বাধীনতাকে মানতেন না এবং মানেনও নি। দুই বাঙলার বিচ্ছিন্নতার এপার-ওপার ঋত্বিক মানতেন না। দেশভাগ তাঁর কাছে ছিল এক যন্ত্রণার নাম। মৃত্যু অব্দি দেশভাগ তাঁকে ভাবিয়েছে। আর তাই সকল কাজের মধ্য ঢুকে পড়তো সীমান্তের কাঁটাতার। কারন তাঁরও পিটে লেগে আছে বিষণ ভারী এক কাঁটাতারের দাগ।

ঋত্বিক ঘটক মানুষ ও তাঁর মৌলিক জীবন নিয়ে ভাবতেন এবং নিজ চলচ্চিত্রে তা প্রস্ফুটিত করতেন। তিনি ঐসব বিরল শিল্পীদের মধ্যে একজন যিনি স্বপ্ন দেখেন ও দেখান যে, চূড়ান্ত অবক্ষয়ের মধ্যেও কীভাবে একটি সুন্দর সমাজ ব্যবস্থার বীজ সুপ্ত থাকে যেখানে শোষক ও শোষিত সম্পর্ক থাকবে না, শ্রেণী বিভাজন থাকবে না, সাম্প্রদায়িকতা, কাড়াকাড়ি, সাংস্কৃতিহীনতা থাকবে না। এমন সমাজ ব্যবস্থাকেই জীবনযাপনের বাস্তব প্রতিশ্রুতি করে গড়ে উঠবে একটি সুস্থ পৃথিবী যেখানে উপনিবেশের পঙ্কিলতা থাকবে না, থাকবে না সাম্রাজ্যবাদী লালসা, প্রথম বিশ্ব তৃতীয় বিশ্ব অভিধাগুলো থাকবে না।

‘আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব যে, ইট ইজ নট এন ইমেজিনারি স্টোরি বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে হাতুড়ি মেরে বোঝাব যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি, সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েন্ট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে উঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে উঠেন, আমার প্রচেষ্টাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।”

এই কিংবদন্তী চলচ্চিত্র পরিচালককে কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো-তিনি কে? কোন হেঁয়ালি ছাড়াই তিনি বলতেন, “আমি মাতাল। ভাঙ্গা বুদ্ধিজীবী। ব্রোকেন ইণ্টেলেকচুয়াল।”

তিনি তাঁর সময়ে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া খুব সাধারণ এক মানুষ। শুভ জন্মদিন ঋত্ব‍িক ঘটক। লাল সালাম।

ঋত্বিক ঘটকের সামগ্রিক চলচ্চিত্র বিষয়ক কাজ চলচ্চিত্র নাগরিক (১৯৫৩) (মুক্তিঃ ১৯৭৭, ২০শে সেপ্টেম্বর), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), বাড়ি থেকে পালিয়ে (১৯৫৯), মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬১), কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), যুক্তি তক্কো গপ্পো (১৯৭৪)

তথ্যচিত্র আদিবাসীওন কা জীবন স্রোত (১৯৫৫) (হিন্দি, বিহার সরকারের অনুদানে তৈরী),বিহার কে দর্শনীয়া স্থান (১৯৫৫) (হিন্দি, বিহার সরকারের অনুদানে তৈরী), সায়েন্টিস অফ টুমরো (১৯৬৭), ইয়ে কৌন (১৯৭০) (হিন্দি), আমার লেলিন (১৯৭০), পুরুলিয়ার ছাউ (১০৭০)

স্বল্প-দৈর্ঘ্যে ছবি ফিয়ার (১৯৬৫) (হিন্দি), রেন্ডিজভোয়াস (১৯৬৫) (হিন্দি), সিভিল ডিফেন্স (১৯৬৫), দুর্বার গতি পদ্মা (১৯৭১)

অসমাপ্ত কাজ ফিচার অরূপকথা/বেদেনী (১৯৫০-৫৩), কত অজানারে (১৯৫৯) , বগলার বাংলাদর্শন (১৯৬৪), রঙের গোলাম (১৯৬৮)

ডকুমেন্টারী উস্তাদ আলাউদ্দিন খান (১৯৬৩), ইন্দিরা গান্ধী (১৯৭২), রামকিঙ্করঃ এ পারসোনালিটি স্টাডী (১৯৭৫)

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ১. ঋত্বিক – সুরমা ঘটক। ২. ঋত্বিক ঘটক-বাংলা উইকিপিডিয়া